খ্রিষ্টধর্ম থেকে বিভাজিত খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজম—মন, প্রার্থনা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে ঈশ্বরীয় নিরাময়ের এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় দর্শন। অপরিচিত ধর্মের আলোকে এই পর্ব তাদের নিয়ে।
ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক বহু যুগ ধরে বিতর্ক ও অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে এক নারীর উদ্যোগে এমন একটি ধর্মীয় আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল যা এই দুই জগতের সেতুবন্ধন ঘটানোর দাবি তোলে—এটি হলো খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজম (Christian Science)।
উৎপত্তি ও প্রবর্তক
খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজম প্রতিষ্ঠা করেন মেরি বেকার এডি (Mary Baker Eddy), যিনি ১৮৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে “Church of Christ, Scientist” প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দাবি করেন, যিশু খ্রিষ্টের আসল শিক্ষা আসলে ছিল “আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান”, যার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক রোগ নিরাময় সম্ভব। এডি তার বিখ্যাত বই “Science and Health with Key to the Scriptures” (১৮৭৫) প্রকাশের মাধ্যমে এই ধর্মের মূল দর্শন ব্যাখ্যা করেন।
মূল বিশ্বাস ও দর্শন
খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজমের কেন্দ্রে রয়েছে “মনই বাস্তব, বস্তু নয়” — এই ধারণা। অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বর হলেন সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী এবং সম্পূর্ণ কল্যাণময় আত্মা; সুতরাং জগতে কোনো সত্যিকারের মন্দ, রোগ বা মৃত্যু নেই—এসব কেবল মানসিক ভ্রম।
তাদের মতে, যিশু খ্রিষ্ট ছিলেন এমন একজন আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী যিনি ঈশ্বরের নিয়ম অনুসারে চিন্তা ও প্রার্থনার মাধ্যমে রোগ সারাতেন। তাই খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজমে চিকিৎসা বলতে মূলত “আধ্যাত্মিক নিরাময়” বোঝানো হয়, চিকিৎসকের বদলে প্রার্থনা ও মানসিক স্বচ্ছতা ব্যবহৃত হয়।
ধর্মীয় চর্চা
এই ধর্মে কোনো পুরোহিত বা যাজক নেই; বরং “রিডার (Reader)” নামে নির্বাচিত সদস্যরা উপাসনা পরিচালনা করেন। উপাসনার কেন্দ্র হলো “Church of Christ, Scientist”, যার প্রধান সদর দপ্তর বোস্টনে অবস্থিত। প্রতি রবিবার বাইবেল ও মেরি বেকার এডির বই থেকে পাঠ করা হয়, আর বুধবারে “টেস্টিমনি মিটিং”-এ অনুসারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাময়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করেন।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কে অবস্থান
খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজমের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো এর চিকিৎসা-বিরোধী মনোভাব। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা চিকিৎসা নিষিদ্ধ বলে না, তবুও অধিকাংশ অনুসারী শারীরিক অসুস্থতাকে “আত্মিক বিভ্রম” বলে ধরে নেন এবং ওষুধের পরিবর্তে প্রার্থনাকেই নিরাময়ের পথ হিসেবে বেছে নেন। এর ফলে অনেক দেশে এই ধর্মকে নিয়ে আইনি বিতর্ক ও শিশুমৃত্যু সংক্রান্ত মামলা হয়েছে।
আধুনিক প্রভাব ও উপস্থিতি
আজকের দিনে খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজমের অনুসারী তুলনামূলকভাবে কমে গেলেও তারা এখনো বিশ্বব্যাপী সংগঠিত। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রকাশনা সংস্থা The Christian Science Publishing Society পরিচালনা করে বিখ্যাত সংবাদপত্র The Christian Science Monitor, যা একটি অত্যন্ত সম্মানিত আন্তর্জাতিক পত্রিকা।
সমালোচনা ও বিশ্লেষণ
সমালোচকেরা বলেন, এই ধর্ম বিজ্ঞানকে আধ্যাত্মিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূল বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী ভিত্তিকে দুর্বল করে। আবার অন্যদিকে অনেক দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, এই ধর্ম মানুষের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য প্রকাশ, যা ধর্ম ও চিন্তার ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে।
উপসংহার
খ্রিষ্টীয় সায়েন্টিজম এক অনন্য ধর্মীয় আন্দোলন—যেখানে বিজ্ঞান ও ধর্ম, প্রার্থনা ও মনোবলকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা দেখা যায়। যদিও এর অনেক বিশ্বাস আজও বিতর্কিত, তবুও এটি মানবচেতনার এমন এক অধ্যায়, যেখানে মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে মানসিক সংযোগের মাধ্যমে বাস্তব জগতকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে।









Leave a Reply